- মোঃ সায়েদুর রহমান
বাংলাদেশে অতি সম্প্রতি নারীদের ওপর যে ধারাবাহিক সহিংসতা, অশালীন আচরণ, কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য এবং শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটছে- তা শুধু ন্যাক্কারজনকই নয়, এটি একটি সমাজের নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বের স্পষ্ট আলামত। কোনো সভ্য সমাজ, কোনো দায়িত্বশীল রাষ্ট্র এমন বাস্তবতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নিতে পারে না। বরং এসব ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- আমরা কোথায় ব্যর্থ, কোথায় পিছিয়ে পড়ছি।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা জরুরি। যদি কোনো নির্বাচনী আইন, সংবিধান কিংবা রাষ্ট্রীয় নীতিতে নারীর চলাফেরা, মতপ্রকাশ বা অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ থাকত- তাহলে হয়তো কেউ তর্কের খাতিরে সেই নিষেধাজ্ঞার ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করত। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো সাংবিধানিক বা আইনগত নিষেধাজ্ঞা নেই। তারপরও যদি পুরুষের হাত ওঠে নারীর গায়ে, যদি ভাষা হয় অশালীন, আচরণ হয় হিংস্র- তবে সেটি রাষ্ট্রের নয়, সমাজের ব্যর্থতা। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, এটি কিছু পুরুষের ব্যর্থতা, যারা মানুষ হিসেবে নিজ দায়িত্ব পালন করতে জানে না।
সাথে গত দেড় যুগের অন্ধকারাচ্ছন্ন শিক্ষা ব্যাবস্থা
রিসার্চ যদি আমরা একটু মনোযোগ দিয়ে করি, তাহলে খুব সহজেই বোঝা যায়- নারীদের “ইকোনমিক ভ্যালু” কোনোভাবেই পুরুষের চেয়ে কম নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই বেশি। অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, পরিবারে, সামাজিক স্থিতিশীলতায়- নারীর অবদান আজ পরিমাপযোগ্য, দৃশ্যমান এবং অপরিহার্য। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রবাসী আয়- নারীরা বাংলাদেশের অর্থনীতির এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী চালিকাশক্তি। যারা এই ইকোনমিক ভ্যালু মাপতে জানে না, বুঝতে শেখেনি, মূলত তাদের কাছ থেকেই এমন সহিংসতা ও অবমাননাকর আচরণ জন্ম নেয়।
সহজ ভাষায় বললে, সমস্যার শিকড় লুকিয়ে আছে শিক্ষার অভাবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির কথা বলছি না। এখানে অনুপস্থিত পুঁথিগত বিদ্যা, কারিগরি শিক্ষা, নৈতিকতা, ভদ্রতা- এমনকি সাধারণ মানবিক বোধ। যে মানুষ নিজের মাকে সম্মান করতে শেখেনি, সে কিভাবে অন্যের মা, বোন বা মেয়ের প্রতি সংযত হবে? যে মানুষ শিক্ষাকে বোঝে না চরিত্র গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে, তার হাত থেকেই এমন বর্বরতা বেরিয়ে আসে।
>>>>>>>>>মতামত:-তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে দালানকোঠার পথে: রিসার্চের শক্তি<<<<<<<<
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো- আমরা এখনো “পরিচয়” খুঁজছি। যেন অপরাধীরা আকাশ থেকে পড়েছে। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, চারদিকে তাকালেই তাদের পাওয়া যায়- ডানে, বামে, সামনে, পেছনে। এরা আমাদেরই সমাজের মানুষ, পরিচিত মুখ, পরিচিত আচরণ। জুলাই মাসে সিলেটে তুলনামূলকভাবে কম মামলা হয়েছে- এই তথ্য হয়তো কাউকে স্বস্তি দেয়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়: মামলা কম মানেই কি অপরাধ কম? নাকি অভিযোগ করার সাহস কমে গেছে?
এখন সময় আর টানার নয়। সময় এসেছে সিদ্ধান্তের। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১২ তারিখে আমরা কিছু ব্যক্তিকে নির্বাচন করব- শুধু ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার জন্য। যারা আজ সহিংসতায় জড়াচ্ছেন, নারীর গায়ে হাত তুলছেন, ভাষাকে অস্ত্র বানাচ্ছেন- তাদের মনে রাখা দরকার, নির্বাচন শুধু এক দিনের ঘটনা নয়। ১২ তারিখের পর ১৩ তারিখও আসবে। সেদিনও সমাজ থাকবে, মানুষ থাকবে, মুখোমুখি হওয়া হবে। তখন যেন লজ্জায় মাথা নিচু করে হাঁটতে না হয়, যেন চোখে চোখ রেখে সালাম দেওয়া অসম্ভব না হয়ে যায়- সেই দায়িত্ব আজই নিতে হবে।
এই লেখা কোনো হুমকি নয়, বরং একটি সামাজিক সতর্কবার্তা। আমরা সবাই একই সমাজে বাস করি। আজ আপনি যাকে অপমান করছেন, কাল হয়তো তার সন্তান আপনার সন্তানের সহপাঠী হবে। আজ যে পরিবেশ আপনি বিষাক্ত করছেন, আগামীকাল সেই পরিবেশেই আপনার সন্তান বড় হবে। প্রশ্ন হলো- আমরা কেমন বাংলাদেশ রেখে যেতে চাই?
একজন মানুষ হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে, যতটুকু করা সম্ভব- সেটুকু করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমি বিশ্বাস করি, এই দেশ ভালো হবে। কিন্তু সেই ভালো হওয়া আসবে না চিৎকারে, সহিংসতায় বা নারীর প্রতি ঘৃণায়। আসবে ধৈর্যে, সংযমে, শিক্ষায় এবং মানবিকতায়। দয়া করে একটু থামুন, একটু শান্ত হন। নিজের স্বার্থের বাইরে গিয়ে ভাবুন আপনার সন্তানদের কথা, ভবিষ্যতের কথা, পরিবেশের কথা।
দেশ ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। সন্তান ভালো থাকলে আমাদের সংগ্রাম সার্থক হবে। আসুন, নারীর প্রতি সন্মান রেখে- সমাজের গায়ে হাত রাখি দায়িত্বের, বিবেকের এবং সম্মানের মাধ্যমে। তবেই একটি সুন্দর বাংলাদেশ সম্ভব।
লেখক, মো. সায়েদুর রহমান, সহযোগী অধ্যাপক,
ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ,
মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেট।
- (বিঃদ্রঃ – লেখাটি লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব মতামত, এখানে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা বা সম্পাদকের কোনো দায় নেই)
আরও পড়ুন:-